শহীদ আব্দুল কাদের মোল্লার শাহাদাতে কাঁদছে বিশ্ববাসী

॥ এক ॥
বাংলাদেশের ইতিহাসে ১২ ডিসেম্বর’১৩ একটি কলঙ্কজনক দিবস হিসেবে চিহ্নিত হয়ে থাকবে। এদিন অত্যন্ত নির্দয়, নিষ্ঠুর ও নির্মমভাবে সরকার শহীদ আব্দুল কাদের মোল্লাকে হত্যা করে। সরকারের দায়ের করা মিথ্যা মামলা ও সাজানো স্বাক্ষীর উপর ভিত্তি করে আদালত তাকে মৃত্যুদন্ডের আদেশ প্রদান করেন। শহীদ আব্দুল কাদের মোল্লার মৃত্যুদ- কার্যকর না করার জন্য জাতিসংঘ মহাসচিব বানকিমুন, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী জন কেরি, তুরস্ক, যুক্তরাজ্য, অষ্ট্রেলিয়াসহ বিভিন্ন দেশ ও মানবাধিকার সংস্থার পক্ষ থেকে সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছিলেন। কিন্তু প্রধানমন্ত্রী দাম্ভিকতার সাথে সে সব অনুরোধ অগ্রাহ্য করে শহীদ আব্দুল কাদের মোল্লাকে হত্যা করেছেন। তার প্রতিহিংসার রাজনীতির মোকাবেলায় মানবতা নিদারুনভাবে বিপর্যস্ত হয়েছে। শহীদ আব্দুল কাদের মোল্লা মহাসত্যের পথে মাথা উঁচু করে দুনিয়া থেকে বিদায় নিয়েছেন। মৃত্যুর পূর্ববর্তী কয়েক ঘণ্টার মধ্যে পরিবারবর্গের সাথে শেষ সাক্ষাতে তিনি যে বীরত্বপূর্ণ ও ঈমানের প্রত্যয়দ্বীপ্ত স্বাক্ষর রেখে গিয়েছেন তা যুগ যুগ ধরে বিশ্ব ইসলামী আন্দোলনের কর্মীদের অনুপ্রাণিত করবে। আব্দুল কাদের মোল্লাকে নৃশংসভাবে হত্যার পর তার পরিবারবর্গকে শেষবারের মত মৃতমুখ দেখার সৌভাগ্য থেকে বঞ্চিত করেছে সরকার। তার পুত্র, জামাতা কাউকে জানাযায় অংশগ্রহণ করতে দেয়া হয়নি। উল্টো শহীদ আব্দুল কাদের মোল্লার পরিবারের উপর রাষ্ট্রের আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী সরকারের নির্দেশে হামলা চালিয়ে অবর্ণনীয় নির্যাতন চালিয়েছে। নিকট ইতিহাসে মুসলিম নামধারী পৃথিবীর কোন জালেম সরকার এমন নৃশংস আচরণ করেছে বলে আমাদের জানা নেই। রাষ্ট্রশক্তিকে অপব্যবহার করে প্রধানমন্ত্রী তার প্রতিহিংসা চরিতার্থ করার জন্য জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারী জেনারেল আব্দুল কাদের মোল্লাকে হত্যা করার পর তিনি বিভিন্ন জনসভায় প্রদত্ত বক্তব্যে যেসব বিষয় তুলে ধরেছেন, তাতে প্রতীয়মান হয়, শহীদ আব্দুল কাদের মোল্লাকে পরিকল্পিতভাবে হত্যা করাই ছিল তার উদ্দেশ্য। ২৭ ডিসেম্বর’১৩ তারিখের জনসভার প্রদত্ত বক্তব্যে তিনি বলেছেন, “কাদের মোল্লার ফাঁসিতে জনগণের আশা-আকাংখার প্রতিফলন ঘটেছে”। জাপান সফর শেষে ২০১৩ সালের ৩১ মে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী গণভবনে আয়োজিত সাংবাদিক সম্মেলনে বলেন, ‘মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী, জাতিসংঘের মহাসচিব বানকিমুন আমাকে ফোন করে আব্দুল কাদের মোল্লাকে ফাঁসি না দিতে বলেছিলেন। দেশে এমন কোন লোক আছে যে এ ফোন পাওয়ার পর এ সাহস দেখাতে পারে?’

প্রধানমন্ত্রীর এ ঔদ্ধ্যত্বপূর্ণ বক্তব্য তার রক্তপিপাসু মনের পরিচয় ও প্রতিহিংসা পরায়ন রাজনীতির মুখোস উন্মোচন করে দিয়েছে। সরকারপ্রধান হিসেবে যে মহানুভবতা, মানবতা ও উদারচিত্ততা প্রদর্শন করা প্রয়োজন ছিল তা তিনি দেখাতে পারেন নি। তার এ ভূমিকায় প্রতীয়মান হয়েছে নিষ্ঠুরতা, পাশবিকতা, নির্মমতা ও প্রতিহিংসা তার বিবেকের চেতনাকে কেড়ে নিয়েছে। সত্য উপলব্ধি করার ক্ষেত্রে তার হৃদয় স্থবির হয়ে পড়েছে। ইতিহাস একদিন এই নিষ্ঠুরতার বিচার করবে। প্রধানমন্ত্রী নিশ্চয়ই উপলব্ধি করছেন রাষ্ট্রশক্তির বলে শহীদ আব্দুল কাদের মোল্লাকে হত্যা করা সম্ভব হলেও বিশ্বের অগনিত মানুষের হৃদয় থেকে শহীদ আব্দুল কাদের মোল্লার প্রতি ভালোবাসা ও শ্রদ্ধাবোধকে নিশ্চিহ্ন করা সম্ভব হয়নি। বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে এ নির্মম ও পাশবিক ঘটনায় মানুষ ক্ষুব্ধ, মর্মাহত ও শোকাহত। আমেরিকা, ইউরোপ, অষ্ট্রেলিয়াসহ মুসলিম বিশ্বে শহীদ আব্দুল কাদের মোল্লার হত্যাকান্ডের নিন্দা ও ক্ষোভ প্রকাশ করে লাখো জনতা প্রতিবাদ জানিয়েছে। বিভিন্ন দেশে অনুষ্ঠিত গায়েবানা জানাযায় হাজার হাজার মানুষ অংশগ্রহণ করেছেন। গোটা ইউরোপে প্রায় ৬০ টি জায়গায় ও তুরস্কে ৬৫ টি স্থানে গায়েবানা জানাযা অনুষ্ঠিত হয়েছে। পবিত্র মক্কা এবং মদীনায় হাজার হাজার প্রবাসী বাংলাদেশী চোখের পানিতে সিক্ত করেছে পবিত্র ক্বাবা এবং মসজিদুন নববীর পবিত্র চত্ত্বর। দিন যতই যাচ্ছে শহীদ আব্দুল কাদের মোল্লার প্রতি বিশ্ব মানবতার শ্রদ্ধা ও সম্মান ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে। সময়ের পরিবর্তনের সাথে সাথে আব্দুল কাদের মোল্লার উপর অবিচার ও রাষ্ট্রীয় চক্রান্তের ঘটনা জনগণের সামনে স্পষ্ট হচ্ছে। সুপ্রীম কোর্টের আপীল বিভাগ কর্তৃক পূর্ণাঙ্গ জাজমেন্ট প্রকাশের পর শহীদ আব্দুল কাদের মোল্লা তার আইনজীবীদেরকে বলেছিলেন, তিনি তার সাংবিধানিক অধিকার বলে রিভিউ আবেদন করবেন। সে জন্য আইনজীবীদেরকে প্রস্তুতি নেয়ার নির্দেশ দিয়েছিলেন তিনি। ২০১৩ সালের ১০ ডিসেম্বর আইনজীবীরা আব্দুল কাদের মোল্লার সাথে সাক্ষাৎ শেষে কারাগেটে অবস্থানরত সাংবাদিকদের নিকট আব্দুল কাদের মোল্লার এ কথা অবহিত করেছিলেন। বাংলাদেশের গণমাধ্যমে এ খবর ব্যাপকভাবে প্রচারিত হয়। ঐদিন সন্ধ্যায় কারাকর্তৃপক্ষ পরিবারকে চিঠি দিয়ে আব্দুল কাদের মোল্লার সাথে সাক্ষাতের কথা জানায়। পাশাপাশি সরকারের আইন প্রতিমন্ত্রী ও স্বরাষ্ট্রপ্রতিমন্ত্রী সাংবাদিক সম্মেলন করে ঘোষণা দেন রাত ১২.০১ মিনিটে আব্দুল কাদের মোল্লার ফাঁসি করে।

ফাঁসি কার্যকরের ৩৪৮ দিন পর ২৫ নভেম্বর ২০১৪ জনাব আব্দুল কাদের মোল্লার দায়ের করা রিভিউ আবেদনের পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশিত হয়। এ রায়ে রিভিউ ‘মেনটেনেবল’ বলে সুপ্রীম কোর্ট ঘোষণা করেন এবং বলেন যে, পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশিত হওয়ার ১৫ দিনের মধ্যে রিভিউ আবেদন দায়ের করতে হবে। অথচ শহীদ আব্দুল কাদের মোল্লার পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশের ৭ দিনের মাথায় ফাঁসি কার্যকর করা হলো। শহীদ আব্দুল কাদের মোল্লা দুনিয়া থেকে বিদায়ের আগে জানতেই পারলেন না সংবিধান অনুযায়ী তার রিভিউ করার অধিকার আছে কি না। এক্ষেত্রে সরকার তাকে আইনের আশ্রয় গ্রহণের যথেষ্ঠ সুযোগ গ্রহণের অধিকার থেকে বঞ্চিত করেছে। যখন আইনের পূর্ণাঙ্গ আশ্রয় নেয়ার সুযোগ থেকে বঞ্চিত করা হয় তখন সেটা হত্যাকা- ছাড়া আর কিছু নয়। তাই ইতিহাসে শহীদ আব্দুল কাদের মোল্লার হত্যাকা- একটি কলঙ্কজনক অধ্যায় হিসেবে চিহ্নিত করতে হবে।

॥ দুই ॥
শহীদ আব্দুল কাদের মোল্লার নির্মম হত্যাকান্ডে সারা বিশ্বের মানুষ জনাব মোল্লার প্রতি আরো সহানুভূতিশীল হয়েছে। ২০১৪ সালের জুন মাসে গ্রেট ব্রিটেন সফরকালে শহীদ আব্দুল কাদের মোল্লার প্রতি মানুষের সীমাহীন ভালোবাসা দেখে উদ্বেলিত হয়েছি। ১৫ জুন ২০১৪ লন্ডনের লিংকনস ইনের এক আনিুষ্ঠানিক ডিনারে উপস্থিত হয়েছিলাম। সেখানে অনেক দেশ থেকে বার. এট. ল ডিগ্রি অর্জনের জন্য আগত ব্যক্তিবর্গের সাথে সাক্ষাত হয়। নেদারল্যান্ডস থেকে আগত একজনের সাথে সাক্ষাত হলো। আমি বাংলাদেশ থেকে এসেছি এই পরিচয় জানার পর তিনি আমাকে উদ্দেশ্য করে অনেকটা তাচ্ছিল্যের সাথে বললেন, ‘তোমার দেশে কোন ন্যায়বিচার নেই। তোমাদের সরকার একজন রাজনৈতিক নেতাকে সুবিচার থেকে বঞ্চিত করেছে। তাকে যথেষ্ট আইনী আশ্রয়ের সুযোগ না দিয়ে তড়িঘড়ি করে মৃত্যুদ- কার্যকর করা হয়েছে। ধিক্ তোমাদের!’

স্কটল্যান্ড থেকে আগত একজনের সাথে সাক্ষাত। তিনি বললেন, ‘তোমরা রাজনৈতিক স্বার্থে প্রতিপক্ষকে হত্যা কর। তোমাদের দেশে কোন মানবাধিকার নেই। আইনের আশ্রয় নেয়ার সুযোগ নেই। তোমাদের দেশে ন্যয়বিচার নেই।’ দক্ষিণ অফ্রিকা থেকে আগত একজন বললেন, ‘তোমাদের দেশে সরকার রাজনৈতিক নেতাদের হত্যা করছে। তোমরা মানুষের অধিকারে বিশ্বাস কর না। তোমাদের দেশে কোন ন্যায়বিচার নেই। তোমাদের দেশ খুবই খারাপ।’ তুরস্ক থেকে আগত একজনের সাথে সাক্ষাত। তিনি আবেগাপ্লুত কণ্ঠে বললেন, ‘তোমাদের দেশে কি কোন আইন আছে? বিচার আছে? তোমরা ওস্তাদ আব্দুল কাদের মোল্লাকে হত্যা করেছ’ এমনিভাবে যত জনের সাথে সাক্ষাত তাদের প্রায় সকলেই বাংলাদেশের বিচার, আইন ও মানবাধিকার নিয়ে প্রশ্ন তুললেন। ঐসব ব্যক্তির নিকট থেকে বাংলাদেশ সম্পর্কে এ ধরণের মন্তব্য আমাদেরকে হতবাক করেছে। সম্ভবত: আইনমন্ত্রী আনিসুল হকও একইভাবে প্রশ্নের সম্মুখীন হয়েছেন। তিনি ২৯ মে ২০১৩ সাংবাদিকদের সামনে বক্তব্যকালে বলেছেন, ‘আমাকে সারা পৃথিবীতে ব্যাখ্যা দিতে হচ্ছে কাদের মোল্লার ব্যাপারে।’ আইনমন্ত্রীর ব্যাখ্যায় বিশ্ববাসী সন্তুষ্ট হতে পারেনি। সরকারের ভূমিকা বাংলাদেশের বিচার ব্যবস্থাকে বিশ্ব দরবারে প্রশ্নবিদ্ধ, বিতর্কিত করেছে। আমাদের দেশের ভাবমর্যাদা ভুলুণ্ঠিত হয়েছে। শহীদ আব্দুল কাদের মোল্লার নির্মম হত্যাকা- সরকারের নিষ্ঠুরতার এক নির্মম স্বাক্ষী। আব্দুল কাদের মোল্লার শাহাদাতে কেঁদেছে বাংলাদেশ, কেঁদেছে সারা বিশ্ব। এই কান্না চলতে থাকবে অনাদি-অনন্তকাল পর্যন্ত। আর লাখো জনতা ধিক্কার দিতে থাকবে আওয়ামী লীগকে, শেখ হাসিনাকে।
লন্ডনে থাকাবস্থায় এক ব্যক্তির সাথে ইষ্ট লন্ডন জামে মসজিদে পরিচয় হলো। তিনি ২৫ বছর যাবৎ লন্ডনে থাকেন। তার সন্তান ও পরিবারের সকলেই লন্ডনের নাগরিক। তিনি গিয়েছিলেন তুরস্কে বেড়ানোর উদ্দেশ্যে। শপিং করতে গিয়েছিলেন এক দোকানে। কেনাকাটা শেষে তিনি মূল্য পরিশোধের সময় বিক্রেতা তার বাংলাদেশী পরিচয় জানতে পারে। ঐ বিক্রেতা টাকা ফেরত দিয়ে বলেন, ‘তুমি যে দেশের লোক সে দেশে আব্দুল কাদের মোল্লাকে অন্যায়ভাবে হত্যা করা হয়েছে। মোল্লা নৃশংসতার শিকার হয়েছে। যে দেশে মোল্লার রক্ত ঝরেছে তুমি সে দেশের নাগরিক। আমি তোমার কাছ থেকে কোন মূল্য নেবো না। মোল্লার সম্মানে এসব আমি তোমাকে উপহার দিলাম। তুমি আমার অতিথি। তুমি কি মোল্লা সম্পর্কে কিছু জানো? তার পরিবারের লোকেরা কেমন আছে? আমি তাদের সম্পর্কে জানতে চাই। মোল্লার জন্য আমার পরিবারে সব সময় কান্না লেগে আছে।’ বাংলাদেশের এ নাগরিক আব্দুল কাদের মোল্লার প্রতি তুরস্কের ঐ ব্যক্তির ভালোবাসা ও আবেগ দেখে বিস্মিত হলেন। তিনি অনেক পীড়াপিড়ি করেও কোন অবস্থাতেই মূল্য পরিশোধ করতে পারলেন না।

কয়েকদিন পর লন্ডনে ফিরে এসে তিনি ইষ্টলন্ডন জামে মসজিদে বাংলাদেশী নাগরিক খুজতেছিলেন। বাংলাদেশী মুসুল্লিদের জিজ্ঞেস করছিলেন, এখানে জামায়াতের কোন লোক আছে কিনা? ঐ সময় আমি সেই মসজিদে নামাজ আদায় করতে উপস্থিত হয়েছিলাম। মসজিদ থেকে বের হয়ে অনেক বাংলাদেশী ছাত্রের সাথে কথা বলছিলাম। কিছুক্ষণের মধ্যেই উপস্থিত প্রাক্তন ছাত্রসংখ্যা ২৫/৩০ জনে দাঁড়ালো। ভীড় দেখে ঐ লোকটি আমাদের দিকে এগিয়ে এসে জিজ্ঞেস করলো, ‘আপনাদের মাঝে কেউ জামায়াতের লোক আছেন কি?’ আমরা ঔৎসুক্যের সাথে তার নিকট পরিচয় তুলে ধরলাম। তিনি আবেগ আপ্লুত কণ্ঠে ঘটনা বিবৃত করলেন। বললেন, ‘আমি আমার পরিবার, পূর্বপুরুষ আওয়ামী লীগের রাজনীতির সাথে সম্পৃক্ত ছিলাম। কিন্তু আজ থেকে আমরা এ ফ্যাসিস্ট দলের সাথে সকল সম্পর্ক ছিন্ন করলাম।’ তিনি বললেন, ‘শেখ হাসিনা বাংলাদেশকে কলঙ্কিত করেছে। আর শহীদ আব্দুল কাদের মোল্লা বাংলাদেশকে গৌরবান্বিত করেছেন। আমি মোল্লাকে শ্রদ্ধা জানাই।’ তার একথা শুনে মনে হলো, শহীদ আব্দুল কাদের মোল্লা শেষ সাক্ষাতে আমাদেরকে বলেছিল, ‘আমার রক্ত আওয়ামী লীগের পতন ডেকে আনবে। মানুষ ইসলাম প্রতিষ্ঠার জন্য উদ্বুদ্ধ হবে। আমার রক্তের বদলা খুনের মাধ্যমে না নিয়ে আল্লাহর দ্বীন প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে নেয়ার জন্য আমি ইসলামী আন্দোলনের কর্মীদের প্রতি আহ্বান জানাচ্ছি।’

লন্ডন ইস্ট জামে মসজিদে বিশ্বের বিভিন্ন স্থান থেকে ভ্রমণে আসা লোকেরা নামাজ পড়তে আসেন। বাংলাদেশের উল্লেখযোগ্য সংখ্যক প্রবাসী নাগরিক এখানে নিয়মিত নামাজ আদায় করেন। কদিন আগে উমরা পালনে সৌদি আরব গিয়েছিলেন সগির আহমদ নামে এক ভদ্রলোক। তার সাথে সাক্ষাত। তিনি বললেন ‘আমি পবিত্র ক্বাবার গিলাফ ধরে অনেককে আব্দুল কাদের মোল্লার জন্য কাঁদতে দেখেছি। মসজিদুননববীর ‘রিয়াজুল জান্নাহ্’তে বহু মুসুল্লিকে শহীদ আব্দুল কাদের মোল্লার জন্য দোয়া করতে দেখেছি।’ জনাব সগির আহমদ আমার নিকট আব্দুল কাদের মোল্লার পরিবারের খবর জানতে চাইলেন।

লন্ডনের হোয়াইট চ্যাপেলের ওয়াটার লিলিতে প্রবাসী বাংলাদেশীদের এক সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে মোল্লা ভাইয়ের শাহাদাত পূর্ব বিভিন্ন ঘটনা তুলে ধরতেই এক হৃদয় বিদারক দৃশ্যের অবতারনা হয়। অসংখ্য মানুষের কান্নায় ওয়াটার লিলিতে এক মর্মভেদী পরিবেশের সৃষ্টি হয়।
শহীদ আব্দুল কাদের মোল্লাকে সরকার হত্যা করতে পেরেছে, কিন্তু তার প্রতি অগনতি মানুষের ভালবাসা কেড়ে নিতে পারেনি। ব্রিটেনের লেষ্টারে ইসলামিক ফাউন্ডেশনে এক আন্তর্জাতিক সেমিনারে যোগ দিয়েছিলাম। বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে বহুসংখ্যক প্রতিনিধি এ সেমিনারে এসেছিলেন। বিরতির ফাঁকে ফাঁকে অংশগ্রহণকারী ব্যক্তিগণ শহীদ আব্দুল কাদের মোল্লার কথা জানতে চাইতেন।
তিনদিনের সে সেমিনারে প্রত্যহ সকালে আমি Morning walk এ বের হতাম। কনফারেন্সের সামনে এক প্রশস্ত জায়গায় ব্যায়াম করাকালে বৃটিশ বংশোদ্ভুত এক নাগরিকের সাথে সাক্ষাৎ। তিনি জানতেন আমি বাংলাদেশ থেকে এসেছি। তিনি একজন মুসলমান। তিনি ইসলামিক ফাউন্ডেশনের কনফারেন্স রুমের দেখাশুনার দায়িত্বে নিয়োজিত আছেন। তিনি বললেন, ‘এখানে একবার আব্দুল কাদের মোল্লা এসেছিলেন। ঠিক এ জায়গাতেই তিনি সকালে ব্যয়্যাম করতেন। আর কোনদিন আমার সাথে আব্দুল কাদের মোল্লার সাক্ষাত হবে না।’ এইকথা বলে তিনি হু হু করে কেঁদে উঠলেন।
শুধুমাত্র আদর্শিক কারণেই আব্দুল কাদের মোল্লাকে হত্যা করা হয়েছে। কিন্তু ইতিহাস স্বাক্ষী, কোন মানুষকে হত্যা করে তার আদর্শকে হত্যা করা যায় না। বরং শহীদি রক্ত সে আদর্শকে আরো মজবুত এবং বেগবান করে। আব্দুল কাদের মোল্লা ছিলেন বাংলাদেশের ইসলামী আন্দোলনের নেতা। শাহাদাতের পর তিনি বিশ্বইসলামী আন্দোলনের নেতা হয়েছেন।

প্রতিটি মানুষের মৃত্যু অনিবার্য। যারা আব্দুল কাদের মোল্লাকে হত্যার ষড়যন্ত্র করেছে এবং তা বাস্তবায়নে যারা সহযোগীতা করেছে তাদেরও নিশ্চয়ই মৃত্যু হবে। কিন্তু দেশের মানুষ তাদেরকে ষড়যন্ত্রকারী, খুনী হিসেবেই বিবেচনা করবে। আর শহীদ আব্দুল কাদের মোল্লাকে মজলুম এবং নিষ্ঠুরতার শিকার বলে মানুষ যুগ যুগ ধরে আবেগাপ্লুত হবে। প্রতিহিংসা সবসময়ই ঘৃণিত, ধিকৃত, প্রত্যাখ্যাত। কিন্তু আদর্শের জন্য জীবনদান লক্ষ লক্ষ মানুষকে উজ্জীবিত করে। আব্দুল কাদের মোল্লার রক্ত বিশ্ব ইসলামী আন্দোলনকে এবং এই আন্দোলনের অসংখ্য কর্মীদেরকে উজ্জীবিত করছে এবং করবে।
আদালতে, আখেরাতে আল্লাহ তায়ালা নিজে যখন বিচারকের আসনে বসবেন তখন এই হত্যাকান্ডের ন্যায়বিচার করবেন এবং হত্যাকারীদের উপযুক্ত শাস্তি দিবেন। সেদিন আব্দুল কাদের মোল্লা তার চোখের সামনে তার হত্যাকারীদের পরিণতি দেখতে পারবেন।

লেখকঃ কেন্দ্রিয় কর্মপরিষদ সদস্য ও কেন্দ্রিয় প্রচার বিভাগের সহকারী সেক্রেটারী, বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী।

Post a Comment

Previous Post Next Post