শহীদ আবদুল কাদের মোল্লার শাহাদাৎ বার্ষিকীতে গোলাম মাওলা রনির চ্যালেঞ্জ

২০০৪ সালের ২৬ জুলাই বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত গোয়ালন্দ, রাজবাড়ী উপজেলার জনতার মাঝে ত্রাণ বিতরণ করেন জননেতা শহীদ আবদুল কাদের মোল্লা
মুহাম্মদ সেলিম উদ্দিন
২০১৩ সালের ১২ ডিসেম্বর জনাব আবদুল কাদের মোল্লাকে ফাঁসি দেয়া হয়। বর্তমান ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ দলীয় সাবেক এমপি, মেধাবী রাজনীতিক গোলাম মাওলা রনির ঐ সময়কার লেখাকে সামনে রেখে আমার এ নিবন্ধ। জনাব রনি ঐ সময় চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দিয়ে বলেন, ‘মিরপুরের কসাই কাদের সম্পর্কে আমি পড়ালেখা করেছি। আবদুল কাদের মোল্লা কসাই কাদের নন। এ বিষয়ে আমি যে কারো চ্যালেঞ্জ নিতে রাজি আছি। নতুন করে তদন্তের জন্য তিনি নিজের অর্থায়নে রাজি বলে জানালেন গোলাম মাওলা রনি। সাংবাদিকরা কাদের মোল্লার সঠিক তথ্য জানতে চাইলে, আমি অর্থ ঢালবো, বলেন গোলাম মাওলা রনি। এ বিষয়ে তাঁর মৃত্যুদণ্ড নিয়েও প্রশ্ন তোলেন আওয়ামীলীগের এই সাবেক সংসদ সদস্য।’

গোলাম মাওলার এ বক্তব্যটি গভীর পর্যালোচনার দাবি রাখে। তিনি কি কারণে ভিন্ন আদর্শিক অবস্থানে থাকার পরেও সাহস করে এ বক্তব্য প্রদান করেছেন সেটিও তাঁর এক ফেইসবুক স্ট্যাটাসে নিজেই লিখেছেন। আর সেটি হলো, তিনি জামিন পেয়ে কারাগার থেকে মুক্ত হওয়ার প্রাক্কালে তার কাছে কাদের মোল্লার পাঠানো চিরকুট।

গোলাম মাওলা রনিকে লেখা কাদের মোল্লার চিরকুট :

প্রিয় রনি,

যদি কখনো সময় পাও এবং তোমার ইচ্ছা হয় তবে আমার ফাঁসির পর একবার হলেও বলো বা লিখো- কাদের মোল্লা আর কসাই কাদের এক ব্যক্তি নয়। আমার আতœা কিয়ামত পর্যন্ত কাঁদবে আর কসাই কাদের তখন কিয়ামত পর্যন্ত অট্টহাসি দেবে।

গোলাম মাওলা রনি লিখেছেন, যুদ্ধাপরাধের দায়ে সাজাপ্রাপ্ত কাদের মোল্লার অন্তিম অনুরোধ রাখতে গিয়ে তিনি এ স্ট্যাটাস দিয়েছিলেন। অন্তিম মুহূর্তের একটি অছিয়ত পালন করে মানুষ হিসেবে তিনি নিজের কর্তব্যটুকু পালন করেছেন বলে জানান।

স্ট্যাটাসে রনি, যেসব তরুণ কাদের মোল্লার ফাঁসি দাবি করছেন, তাদেরকে কাদের মোল্লার গ্রামের বাড়ি ফরিদপুর জেলার সদরপুর থানার আমিরাবাদে যাওয়ার অনুরোধ করেছেন এবং খোঁজখবর নিতে বলেছেন।

আমি মনে করি, তরুণ প্রজন্মের অগ্রসেনানী গোলাম মাওলা রনির এ আহ্বানে সকলের সাড়া দেয়া উচিত। আমি একইভাবে মিডিয়ার বন্ধুদের প্রতি বিনীত আহ্বান জানাই, আপনারাও গোলাম মাওলা রনি সাহেবের চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করে সত্য উদঘাটনের মহৎ উদ্দেশ্যে তার আহ্বানে সাড়া দিন।

মিডিয়াকে তো বলা হয় সমাজের দর্পণ। কোনো প্রভাবশালী মহলের অবৈধ চাপে সত্যকে গোপন করা আপনাদের স্বভাবজাত বৈশিষ্ট্য নয়। রনি সাহেবের চ্যালেঞ্জ প্রদানের সময় তো প্রায় ১ বছর পার হতে চলেছে। কিন্তু এই চ্যালেঞ্জ গ্রহণে আপনাদের এতো সময় লাগছে কেন? সত্য উদঘাটিত হলে আপনাদের মধ্য থেকেও ওই অংশটির মুখোশ উন্মোচিত হয়ে যেতে পারে, যারা কাদের মোল্লার ফাঁসির দাবিতে আয়োজিত তথাকথিত শাহবাগ মঞ্চে একাত্মতা প্রকাশ করেছিলেন। কয়েক’শ লোককে কয়েক হাজার, কয়েক হাজারকে কয়েক লক্ষ দেখিয়ে মিনিটের পর মিনিট লাইভ কাস্ট করেছেন। পত্রিকার পুরো কাভার পেইজ জুড়ে তরুণ প্রজন্মের দাবি ফাঁসি-ফাঁসি নিউজ হেডলাইন করেছেন। সেদিন বেশি দূরে নয়, যেদিন সত্য প্রকাশিত হবে। আপনারা আমরা না থাকলেও সে সময়ের প্রজন্ম সত্যের সন্ধান পেয়ে সত্য পথের পথিক শহীদ আবদুল কাদের মোল্লার আদর্শ কে বুকে ধারণ করবে আর মিথ্যা ও তার অনুসারীদের ঘৃণা ভরে প্রত্যাখ্যান করবে।

রাজনৈতিক প্রতিহিংসার শিকার আবদুল কাদের মোল্লা :

পারিবারিক, একাডেমিক ও ঐতিহাসিক সূত্রমতে দেখা যাচ্ছে, শহীদ আবদুল কাদের মোল্লা ১৯৭১ সালে ঢাকাতেই ছিলেন না। তিনি মুক্তিযুদ্ধের সময় নিজ গ্রামের বাড়ি ফরিদপুরে অবস্থান করছিলেন। দালাল আইনে ৩৭ হাজার লোকের নামে মামলা করা হলেও তখন তার নামে কোথাও একটি জিডিও করা হয়নি। কোন হত্যাকাণ্ডের সাথে যুক্ত থাকলে তিনি সত্তরের দশকের এ উত্তাল সময়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের হলে থেকে অধ্যয়ন করা এবং ঢাকা শহরের শীর্ষস্থানীয় শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শিক্ষকতা পেশায় নিয়োজিত থাকতে পারা কিভাবে সম্ভবপর হয় যৌক্তিক কারণে সে প্রশ্ন উঠতেই পারে। শুধুমাত্র রাজনৈতিক প্রতিহিংসার কারণেই ৪২ বছর পর বর্তমান সরকার মানবতাবিরোধী বিচারের নামে মিরপুরের কসাই কাদেরকে কাদের মোল্লা হিসাবে চিহ্নিত করে তাকে মিথ্যা মামলা দিয়ে মৃত্যুদণ্ডাদেশ প্রদান করেন।

তাছাড়া কাদের মোল্লার সাংবিধানিক অধিকারগুলোও তাঁর ব্যাপারে প্রযোজ্য হলো না কেন? সরকার তাড়াতাড়ি মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের হেতুটা কি? এ প্রশ্নটি যুগ-যুগ ধরে মানুষের মনে থেকেই যাবে।

অতিসম্প্রতি মহমান্য সুপ্রিম কোর্টের এপিলেট ডিভিশন কর্তৃক কাদের মোল্লার রিভিউ পিটিশনের প্রদত্ত রায়ে সম্মানিত বিচারপতিগণ সর্বসম্মত রায় প্রদান করেছেন, মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত ব্যক্তিরাও পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশের ১৫ দিনের মধ্যে রিভিউ করার সুযোগ পাবেন। স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠেছে তাহলে কাদের মোল্লা এ সুযোগটি পেলেন না কেন? তাহলে কি সরকার কর্তৃক সংবিধানের প্রদত্ত সকল নাগরিকের মৌলিক অধিকার হরণ হলো না? এর দায় নিবে কে? কাদের মোল্লাকে রিভিউয়ের সুযোগ দিলে তিনি হয়তো ন্যায় বিচার পেতেন। তাহলে তো তিনি মৃত্যুদণ্ডের হাত থেকে বেঁচে যেতেন। তাইতো গণস্বাস্থ্যের প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরীসহ দেশ ও বিদেশের অনেক বিশিষ্ট নাগরিক ও মানবাধিকার সংগঠনের পক্ষ থেকে কাদের মোল্লার মৃত্যুদণ্ডকে জুডিশিয়াল হত্যাকাণ্ডের সাথে তুলনা করেছেন।

মানবতাবিরোধীদের বিচারের ট্রামকার্ড ব্যবহার করছেন এবং নিজের প্রতিবেশী পাশের বাড়ির মানুষ শহীদ আবদুল কাদের মোল্লা, সাবেক মন্ত্রী জননেতা আলী আহসান মুহাম্মদ মুজাহিদ, যাদের বংশ বুনিয়াদ আপনার অতিপরিচিত। যাদের সাথে অনেক ওঠাবসা করেছেন, নিজ হাতে আপ্যায়ন করিয়েছেন বলে জনশ্রুতি রয়েছে। রাজনৈতিক প্রয়োজনে যে দলের ঊর্ধ্বতন নেতাদের দোয়া ও সমর্থন পাওয়ার জন্যে আপনার দলের পক্ষ থেকে ডেলিগেশন পাঠিয়েছেন, এক টেবিলে বসে সাংবাদিক সম্মেলন করেছেন।

যে দলের নেতাদের ইমামতিত্বে আপনার দলের নেতারা জামায়াতে নামাজ আদায় করেছেন। কর্মসূচি নির্ধারণে আপনার দলের নেতাদের বাড়িতে ঘণ্টার পর ঘণ্টা যৌথ মিটিং শেষে আদর আপ্যায়ন করেছেন। আপনাদের নিজস্ব ধাঁচের রাজনৈতিক বৈশিষ্ট্য ও রাজনৈতিক অপকৌশলে অভ্যস্ত হওয়ার কারণে তাঁদেরকে রাজাকার, স্বাধীনতাবিরোধী, সাম্প্রদায়িক, মৌলবাদী ইত্যাদি না হয় বলতেই পারেন। কিন্তু তাই বলে শুধুমাত্র নামের মিল থাকার প্রেক্ষিতে চিহ্নিত রাজাকার, খুনী, মীরপুরের কসাই কাদেরের দোষ আপনার পাশের বাড়ির কাদের মোল্লার ঘাড়ে চাপিয়ে দিয়ে তাঁর মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করে সভ্যতা-ভব্যতা, ন্যায় ও মানবতাবোধের কবর রচনা করেছেন।

আমি নিশ্চিত এদেশের মানুষ একদিন জানবেন আবদুল কাদের মোল্লা কসাই কাদের নন। সেদিন সত্য জানার আনন্দে মানুষের মধ্যে খুশির বন্যা বয়ে যাবে, শান্তি পাবে শহীদ আবদুল কাদের মোল্লার বিদেহী আত্বা। আর মিথ্যার বেসাতি ছড়িয়ে আজকে যারা দম্ভ করে বুক ফুলিয়ে সত্যকে পদদলিত করে ক্ষমতার স্বাদ চুষিয়ে গ্রহণ করছে, সেদিন তাদের আদর্শের অনুসারীরা মাথা নত করে অপরাধীর বেশে পালিয়ে বেড়াবে। মহান আল্লাহর তায়ালা’র পবিত্র বাণী- ‘সত্য সমাগত, মিথ্যা অপসৃত, মিথ্যার পতন অবশ্যম্ভাবী।’

লেখক : কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ সদস্য, বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী ও সাবেক কেন্দ্রীয় সভাপতি, বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবির।

Post a Comment

Previous Post Next Post