করুনাময় মহান আল্লাহর অশেষ রহমতে অবশেষে আমি মুক্তি পেলাম আওয়ামী জুলুম শাহীর কারাগার থেকে। এক এক করে ১৩টি মাস ওরা আমাকে আবদ্ধ করে রেখেছিল। শুধুই কি ১৩টি মাস! নাহ! দুই বারে মিলিয়ে মোট ১৯টি মাস হাসিনা সরকার আমাকে বন্দী করে রেখেছিল।
প্রথমবার ২০১১ সালের ২২ সেপ্টেম্বর থেকে ২০১২ সালের ২২ মার্চ পর্যান্ত ৬ মাস। ২য় বার ২৫ মে ২০১৩ থেকে ২৬ মে ২০১৪ পর্যান্ত ১৩ মাস। বলা যায় ২০১১, ২০১২, ২০১৩, ২০১৪ এই চারটি সাল আমার জীবনের এক ঐতিহাসিক অধ্যায়ের সাথে যুক্ত হয়ে থাকল।
১৭ দিনের রিমান্ড আর রিমান্ডের পুর্বে মধ্যযুগীয় কায়দায় নির্মম নির্যাতনের স্টিম রোলার ওরা চালিয়েছিল। উপড়ে পেলেছিল ডান পায়ের কনিষ্ঠ আঙগুলের নোখ। ভেঙ্গে দিয়েছিল আমার কোমর। নির্যাতনের শুরুতেই অকথ্য ভাষায় গালি গালাজ করে বলেছিল তোকে গুম কিংবা খুন করতে পারিনি মিডিয়া জেনে যাওয়ার কারনে। তবে “তোকে চিরতরে পঙ্গু করে দেব”।
আমি আল্লাহর কাছে সাহায্য চেয়েছি, প্রার্থনা করেছি ধৈর্য্য ধারনের। আমি নিশ্চিত আল্লাহ আমার সহায় ছিলেন। কারন নির্মম নির্যাতনে জ্ঞান হারিয়েছি তবু ওদের কাছে মাথা নত করিনি। ওরা আমার কোমর ভেঙ্গেছে কিন্তু মনোবল ভাঙ্গতে পারেনি। কারাগারা থাকা অবস্থাই আমি সুস্থ হই।
আমি এক মুহুর্তের জন্যও হতাশ হইনি। আমাকে দ্রুত মুক্ত করার জন্য দায়িত্বশীলদের জালাতন করিনি। কারন আমি কারাগারে সান্নিধ্য পেয়েছি বিশ্ব ইসলামী আন্দোলনের সিপাহসালার আমীরে জামায়াত মাওলানা মতিউর রহমান নিযামী সাহেবকে। যিনি আমার মাথায় হাত বুলিয়ে দোয়া করে বলেছিলেন “চিন্তা করোনা সাহস রাখ মেঘ কেটে যাবে”।
সান্নিধ্য পেয়েছি বিশ্ববরেণ্য মুফাসসিরে কুরআন আল্লামা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী হুজুরকে। যিনি তার বরকতময় চুম্বন এঁকে দিয়েছিলেন আমার কপালে। আর মুক্তি পাওয়ার দিন কোলাকোলি করে আমার কপালে চুমু দিয়ে দোয়া করে বিদায় জানাতে জানাতে বলেছিলেন “যাও মুক্ত হয়ে দ্বীন প্রতিষ্ঠায় ঝাপিয়ে পড়, আল্লাহ তোমাদের সহায় হবেন”।
আমার আত্মীয় স্বজনরা আমাকে বারবার একটি প্রশ্ন করতো কেন আমি এই পথ বেছে নিলাম। তখন আমার কন্ঠে আনমনে বেজে ঊঠত মরহুম কবি মতিউর রহমান মল্লিক ভাইয়ের সেই গানটি-
“আমাকে যখন কেউ প্রশ্ন করে কেন বেছে নিলে এই পথ, কেন ডেকে নিলে এ বিপদ?
জবাবে তখন বলি, মৃদু হেসে যাই চলি, বুকে মোর আছে হিম্মত”।
যারা আমাদের অসংখ্য ভাইকে হত্যা করেছে, পঙ্গু করে দিয়েছে তারা আমাকেও চেয়েছিল তেমনটি করতে। কিন্তু কি লাভ হয়েছে তাদের? শহীদ আবদুল কাদের মোল্লাকে ফাঁসির কাষ্ঠে ঝুলিয়ে তার উত্তরসুরীদের কি দমাতে পেরেছে? নাকি পেরেছে তাদের মনোবল ভাঙ্গতে?
মুক্ত হয়ে মায়ের কাছে গিয়ে বলেছিলাম- মা তুমি আমাকে নিয়ে আর একটুও টেনশন করোনা। টেনশন করে কি আমাকে গ্রেফতার থেকে রক্ষা করতে পেরেছ? না পারনি। আল্লাহ আমার জন্য যে পরীক্ষা বরাদ্ধ করে রেখেছেন তা আমাকে মেনে নিতে হবেই। শুধু দোয়া কর যেন ইমানের পরীক্ষায় উত্তীর্ন হতে পারি। মাকে বলে এসেছি, আমি এখন সুস্থ আলহামদুলিল্লাহ।
আমি আবার প্রস্তুত সত্য-মিথ্যার চিরন্তন লড়াইয়ে বিজয়ী হতে। কারন মল্লিক ভাইয়ের সেই কবিতা আমার হৃদয়ে স্পন্দিত হচ্ছে-
এখনো মানুষ মরে পথের পরে,
এখনো আসেনি সুখ ঘরে ঘরে
কি করে তাহলে তুমি নেবে বিশ্রাম
কি করে তাহলে ছেড়ে দেবে সংগ্রাম”।
সম্পাদনায়/এম/এ/আর/সেনবাগ প্রতিনিধি