নোয়াখালীতে ক্ষমতাসীন দলের ছত্রছায়ায় চাঁদাবাজি ||

নোয়াখালীর ৯ উপজেলায় চাঁদাবাজরা বেপরোয়া হয়ে উঠেছে। ক্ষমতাসীন দলের ছত্রছায়ায় চাঁদাবাজরা রয়েছে ধরাছোঁয়ার বাইরে। এলাকাবাসী চাঁদাবাজদের কারণে আতংকে রয়েছে। এলাকাবাসী ও পুলিশ সূত্রে জানায়, গত ১ বছরে জেলা শহর এবং ৯ উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়ন ও গ্রামে প্রবাসীদের কাছে পাকা ভবন, দোকান নির্মাণ, পুকুরে মাটি ভরাট, জমি বিক্রি, পরিবহন, বিয়ে অনুষ্ঠান ও মেঘনা নদীতে মাছ ধরা ট্রলারে ক্ষমতাসীন দলের নামপরিচয়ধারী কর্মী-সমর্থকদের বিরুদ্ধে কোটি কোটি টাকা চাঁদাবাজির অভিযোগ উঠেছে। দাবিকৃত চাঁদা না পেয়ে হামলা, ভাংচুর, নির্মাণ কাজে বাধাসহ অপহরণ ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটিয়েছে চাঁদাবাজরা।

আহত করেছে শতাধিক নারী-পুরুষকে। ফলে ভুক্তভোগীরা অধিকাংশ ঘটনায় থানায় ও কোর্টে মামলা করলেও কোনো কাজ হয়নি। চাঁদাবাজরা প্রকাশ্যে ঘোরাফেরা করলেও রহস্যজনক কারণে রয়েছে ধরাছোঁয়ার বাইরে। উল্টো ভুক্তভোগীদের মামলা প্রত্যাহার করতে আসামিরা বিভিন্ন সময় মোবাইলে প্রাণনাশের হুমকি দেয়। এতে অধিকাংশ বাদী এলাকা ছেড়ে প্রাণের ভয়ে পালিয়ে বেড়াচ্ছে। সর্বশেষ বেগমগঞ্জ উপজেলার রাজগঞ্জ বাজারে রাফি গার্মেন্ট মালিক আলেয়া বেগমের কাছে ইউনিয়ন যুবলীগের আহ্বায়ক পুলক ও তার ভাই অলকসহ তাদের সমর্থকরা ১০ লাখ টাকা চাঁদা দাবি করে। চাঁদা না পেয়ে চলতি বছর ২৬ জানুয়ারি রাতে পুলক ও অলকের নেতৃত্বে ১০ থেকে ১২ জন লাঠিসোটা নিয়ে রাফি গার্মেন্টে হামলা ও ভাংচুর করে ২০ হাজার টাকা এবং মালামালসহ ১৫ লাখ টাকা লুট ও ক্ষতি করে। এ ব্যাপারে আলেয়া বেগম বাদী হয়ে অলক ও পুলকসহ ৮ জনকে আসামি করে বেগমগঞ্জ মডেল থানায় মামলা করেছে। একই ইউনিয়নের আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক মফিজ উল্লার ছেলে চাঁদাবাজ ফিরোজ আলম শিক্ষক নাছির উদ্দিন পারভেজের কাছে গত ২৫ নভেম্বর ১ লাখ টাকা চাঁদা দাবি করে। চাঁদা দিতে রাজি না হওয়ায় রাতে নাছিরের বাড়িতে ফিরোজ আলমের নেতৃত্বে ১০ থেকে ১২ জন হামলা চালিয়ে দেড় লাখ টাকার মোটরসাইকেল, ২০ হাজার টাকা, ৫ ভরি স্বর্ণ ও মালামালসহ লুট করে। নাছির উদ্দিন পারভেজ বাদী হয়ে ফিরোজ আলম ও তার ক্যাডার জাফর, মাহবুবুর রহমানসহ ১১ জনকে আসামি করে বেগমগঞ্জ থানায় মামলা করেছে। ফিরোজ আলম ও তার বাহিনী একই ইউনিয়নে চাঁদা না পেয়ে লক্ষণপুর গ্রামের পণ্ডিতবাড়ি, হাফিজ বেপারিবাড়ি, গজারিবাড়ি, সাইফ উদ্দিন মেম্বারের বাড়ি ও খুরশীদ আলম মঞ্জিলসহ ২০ থেকে ২৫ বাড়িতে হামলা-ভাংচুর করে প্রায় ৫০ লাখ টাকা লুট ও ক্ষতি করে।

নোয়াখালী পৌরসভার উত্তর সোনাপুর আহাম্মদিয়া হাইস্কুলসংলগ্ন নিখিল চন্দ্র কর্মকার ও সুনীল চন্দ্র কর্মকারের কাছে পাশের মধ্যম করিমপুর গ্রামের আমীর হোসেনের ছেলে যুবলীগ ক্যাডার শাওন, আবুল হোসেনের ছেলে কাউসার ১০ হাজার টাকা চাঁদা দাবি করে। চাঁদা না পেয়ে শাওন ও কাউসারের নেতৃত্বে ১০ থেকে ১৫ সন্ত্রাসী গত ২৮ অক্টোবর সকাল ৮টায় নিখিল চন্দ্র কর্মকার ও সুনীল চন্দ্র কর্মকারের বাড়িতে হামলা, ভাংচুর ও লুটপাট করে। পৌরসভার মাইজদী গ্রামের রহমত উল্লার ছেলে চাঁদাবাজ রাইসুল হায়দার প্রকাশ বাবু, জাফর আহমেদ ভূঁইয়া, মৃত হাসমত উল্লার ছেলে হেলাল উদ্দিন, আবদুল গফুরের ছেলে হেলাল, সেকান্দরের ছেলে হুমায়ুন, তাজুল ইসলাম ও কাশেমের ছেলে রুবেল এলাকায় প্রবাসী ও স্থানীয়রা নতুন বাড়ি, পুকুরে মাটি ভরাট, জমি বিক্রি করতে গেলে তাদের কাছে মোটা অংকের চাঁদা দাবি করে। চাঁদা না পেলে ওইসব নতুন ভবন নির্মাণ, পুকুরে মাটি ভরাট ও জমি বিক্রি করতে বাধা দেয়।

সদর উপজেলা কালাদরাপ ইউনিয়নের পশ্চিম দেবীপুর গ্রামের নূর মোহাম্মদ ও সুমনের কাছে ২ লাখ টাকা চাঁদা দাবি করে একই গ্রামের সফিউল্লার ছেলে যুবলীগ ক্যাডার জাবেদ, আলী আজমের ছেলে কামাল, পাশের বারাইপুর গ্রামের আবদুস সালামের ছেলে আবু তাহের ও মনির আহমেদের ছেলে বাবর। চাঁদাবাজরা চাঁদা না পেয়ে গত ১০ আগস্ট রাতে নূর মোহাম্মদ ও সুমনের বাড়িতে হামলা চালিয়ে এলোপাতাড়ি পিটিয়ে এবং কুপিয়ে ১৫ জনকে গুরুতর আহত ও লুটপাট করে। হাতিয়া উপজেলার ওঁচখালী ছেরাজুল হক সুপার মার্কেটে নিকাহ রেজিস্ট্রার কাজী আবদুর রহীমের কাছে মোটা অংকের চাঁদা দাবি করে একই এলাকার লুৎফর রহমানের ছেলে যুবলীগ ক্যাডার এনায়েত রাব্বী। চাঁদা না পেয়ে ওই সন্ত্রাসীরা কাজী আবদুর রহীমের অফিসে হামলা, ভাংচুর করে গত ১০ জুলাই তালা ঝুলায়। এ ব্যাপারে নোয়াখালী জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক একরামুল করিম চৌধুরী এমপি জানান, আমি কখনও চাঁদাবাজ প্রশ্রয় দিই না। পছন্দও করি না। আওয়ামী লীগে চাঁদাবাজের স্থান নেই। যারা চাঁদাবাজি করছে তারা আওয়ামী লীগের কর্মী-সমর্থক নয়। পুলিশকে চাঁদাবাজদের গ্রেফতারের নির্দেশ দেয়া হয়েছে।

দৈনিক সেনবাগের কণ্ঠ/ ১৫ ফেব্রুয়ারি, ২০১৫।

Post a Comment

Previous Post Next Post