সাঈদীর আপিলের রায় দু’মাস অপেক্ষমাণ

দু’মাস আগে আপিলের শুনানি শেষ হয়েছে। জামায়াতে ইসলামীর নায়েবে আমির দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর দণ্ডাদেশের আপিলের রায় অপেক্ষমাণ। মুক্তিযুদ্ধকালে মানবতাবিরোধী অপরাধ তথা যুদ্ধাপরাধের মামলায় ট্রাইব্যুনাল সাঈদীকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছেন। আইন সংশ্লিষ্টরা বলছেন, আপিলের রায় কবে হবে তা নির্ধারণের এখতিয়ার আদালতের। উদ্বিগ্ন হওয়ার কিছু নেই। অন্যদিকে পিরোজপুরে সাঈদীর অপরাধের ভুক্তভোগী ও রাষ্ট্রপক্ষের সাক্ষীরা উদ্বিগ্ন।
আপিলের রায় ঘোষণা হওয়ার পর কার্যকর হওয়ার আগে আরও প্রক্রিয়া রয়েছে। আপিলের পূর্ণাঙ্গ প্রকাশ, আপিলের রায় পুনর্বিবেচনা (রিভিউ) ও রাষ্ট্রপতির অনুকম্পা লাভের (প্রাণভিক্ষা, ক্ষমাপ্রার্থনা) পর্বগুলো রয়েছে। মৃত্যুদণ্ড বহাল থাকলে তা কার্যকর হওয়ার আগে এ প্রক্রিয়াগুলো সম্পন্ন হবে।
গত বছরের ২৪ সেপ্টেম্বর দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর দণ্ডাদেশের বিরুদ্ধে সুপ্রিমকোর্টের আপিল বিভাগে আপিলের শুনানি শুরু হয়। প্রধান বিচারপতি মো. মোজাম্মেল হোসেনের নেতৃত্বে পাঁচ বিচারপতির বেঞ্চে শুনানি হয়। বেঞ্চের অন্য সদস্যরা হলেন-বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহা, বিচারপতি মো. আবদুল ওয়াহ্হাব মিঞা, বিচারপতি হাসান ফয়েজ সিদ্দিকী ও বিচারপতি এএইচএম শামসুদ্দিন চৌধুরী। আসামি ও রাষ্ট্রপক্ষ চলতি বছরের ১৬ এপ্রিল ৫০ কার্যদিবসে শুনানি শেষ করে। ওইদিন থেকেই আপিলের রায় অপেক্ষমাণ (সিএভি) রাখা হয়। এরপর ৬২ দিন পেরিয়ে গেলেও আপিলের রায় হয়নি।
এর আগে মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে ২০১৩ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর বিরুদ্ধে সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ডের আদেশ দেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১। রায়ে সাঈদীর বিরুদ্ধে ২০ অভিযোগের মধ্যে আটটি সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হয়। এর মধ্যে পিরোজপুরের ইব্রাহিম কুট্টি ও বিসা বালীকে হত্যার দায়ে সাঈদীকে
মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়। এছাড়া তার বিরুদ্ধে ধর্ষণের দুটি, ধর্মান্তরিত করার একটি এবং লুণ্ঠন, অগ্নিসংযোগ ও নির্যাতনের তিন অভিযোগ প্রমাণিত হয়। দুটি অভিযোগে মৃত্যুদণ্ড হওয়ায় অন্য অভিযোগগুলোতে আলাদা করে কোনো দণ্ড দেওয়া হয়নি।
ট্রাইব্যুনালের রায়ে মৃত্যুদণ্ড দেওয়ার প্রতিবাদ জানিয়ে জামায়াতে ইসলামীর কর্মী-সমর্থকরা দেশের নানা স্থানে উপর্যুপরি কয়েক দিন হিংসাত্মক তাণ্ডব চালিয়েছিল।
রায় ঘোষণার ২৯ দিনের মাথায় ২৮ মার্চ রাষ্ট্র ও আসামিপক্ষ আপিল বিভাগে আপিল করে। আসামিপক্ষ সাঈদীর মৃত্যুদণ্ডাদেশ বাতিল চেয়ে খালাসের আর্জি জানায়। অপরপক্ষে ছয়টি অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ার পরও দণ্ড ঘোষণা না হওয়ায় এ ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ সাজা চেয়ে আপিল করে রাষ্ট্রপক্ষ।
জানতে চাইলে অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম বলেন, ‘কবে সাঈদীর রায় হবে তা নির্ধারণ করবেন আদালত। এখানে আমাদের কিছুই করার নেই।’ তিনি বলেন, পাঁচ বিচারপতি রায় লেখার পর তা সমন্বয় করতে একটু বেশি সময় লাগতে পারে।
রাষ্ট্রপক্ষের কৌঁসুলিদের প্রধান সমন্বয়কারী হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলেন সাবেক অতিরিক্ত অ্যাটর্নি জেনারেল এমকে রহমান। তিনি বলেন, রায় ঘোষণা আদালতের এখতিয়ার। জনগণ রায় জানতে চায়। সেজন্য একটি যৌক্তিক সময়ে রায় হওয়া উচিত।
বিপরীতে আসামিপক্ষের কৌঁসুলি তাজুল ইসলাম গতকাল বলেন, ‘দু’মাসে কেন, দু’বছরেও রায় হওয়ার দরকার আছে কী?’
ট্রাইব্যুনালে তদন্ত সংস্থার সিনিয়র সদস্য এম সানাউল হক গত শনিবার সকালের খবর বলেন, আপিল বিভাগের নিজস্ব কার্যসূচি রয়েছে। সেটা অনুযায়ীই আপিল বিভাগ কর্মপন্থা ঠিক করেন। তাই কবে, কখন আপিল বিভাগ রায় দেবেন, সেটা তারা নির্ধারণ করবেন। রাষ্ট্রপক্ষ মামলার সাক্ষী ও ভুক্তভোগীদের নিয়ে উদ্বিগ্ন নয়। তবুও রায় দ্রুত ঘোষণা হয়ে সেটা কার্যকর হোক-এটা সব মামলায় তদন্ত সংস্থা প্রত্যাশা করে।
ট্রাইব্যুনালে সাঈদীর মামলায় রাষ্ট্রপক্ষের কৌঁসুলি সাংসদ নূরজাহান বেগম মুক্তা সকালের খবরকে বলেন, উভয় পক্ষের সাক্ষ্য-প্রমাণ ও যুক্তি পর্যালোচনা করেই আপিল বিভাগ যথাসময়ে রায় দেবেন। আপিলের রায় হচ্ছে না, এতে উদ্বিগ হওয়ার কিছু নেই।
১৯৭৩ সালের আন্তর্জাতিক অপরাধ (ট্রাইব্যুনাল) আইনে গঠিত ট্রাইব্যুনালগুলো বিভিন্ন মামলার নিষ্পত্তিতে বিভিন্ন সময় নিয়েছেন। যুক্তি উপস্থাপন শেষে দুই ট্রাইব্যুনাল জামায়াতের আমির গোলাম আযমের মামলাসহ ১০টি মামলার রায় দিয়েছেন গড়ে এক থেকে দেড় মাসে। ট্রাইব্যুনাল-১ গোলাম আযমের মামলার রায় দিতে প্রায় তিন মাস সময় নেন। ১৮ দিনের মাথায় ট্রাইব্যুনাল-২ গত বছরের ৫ ফেব্রুয়ারি জামায়াতের আবদুল কাদের মোল্লাকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেন। সুপ্রিমকোর্টের আপিল বিভাগ শুনানি শেষে ৫৪ দিন পর ১৭ সেপ্টেম্বর যাবজ্জীবনের সাজা বাড়িয়ে কাদের মোল্লার ফাঁসির রায় দেন। এই রায় পূর্ণাঙ্গরূপে বের হয় দু’মাস ১৮ দিনে। তার আগেই কাদের মোল্লার ফাঁসি হয়ে যায়।
একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটির ভারপ্রাপ্ত সভাপতি শাহরিয়ার কবির সাঈদীর আপিলের রায় ঘোষণায় দীর্ঘ সময় লাগছে বলে মনে করেন এবং বলেন, ‘আমরা উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছি। দ্রুত আপিলের রায় দিয়ে তা বাস্তবায়ন করতে হবে।’
গত ২৮ এপ্রিল জাতীয় জাদুঘরের সামনে গণজাগরণ মঞ্চের একাংশ সাঈদীর আপিলে রায় অবিলম্বে ঘোষণার দাবি জানায়। ওইদিন মঞ্চের এক সংগঠক রুহুল আমিন বলেন, সব যুদ্ধাপরাধীর সর্বোচ্চ শাস্তি দিতে বর্তমান সরকার প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। কিন্তু কোনো ধরনের ষড়যন্ত্র হলে তরুণ প্রজন্ম প্রতিরোধ গড়ে তুলবে।
গণজাগরণ মঞ্চের অন্যতম কর্মী মারুফ রসুল শনিবার বলেন, ‘মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার নিয়ে সাম্প্রতিক আইনমন্ত্রীর মন্তব্যে আমাদের মনে শঙ্কার জন্ম দিয়েছে। বিচার নিয়ে নতুন কোনো ষড়যন্ত্র হচ্ছে কি না সে সম্পর্কে আমরা শঙ্কিত। তবুও আমরা যুদ্ধাপরাধের বিচারে আশাহত নই। বিচার অবশ্যই শেষ করতে হবে। আইনের গতিধারা ঠিক থাকলে আপিলে সাঈদীর রায় এতদিনে হওয়ার কথা।’
রাষ্ট্রপক্ষ জানায়, সাঈদীর বিরুদ্ধে যারা সাক্ষ্য দিয়েছেন তাদের অনেকেই পিরোজপুরের বাসিন্দা এবং হিন্দু ধর্মের। দ্রুত রায় ঘোষণা না হওয়ায় তারা উদ্বেগের মধ্যে রয়েছেন। হুমকিতে ভীত হয়ে বিসা বালীর ভাই সুখরঞ্জন বালী ভারতে গিয়ে ধরা পড়েছেন বলে জানায় রাষ্ট্রপক্ষ।

উৎসঃ   sokaler khobor

Post a Comment

Previous Post Next Post