প্রধানমন্ত্রী যে শিশুকে দেখে কেঁদেছিলেন সে মোমবাতির আগুনে দগ্ধ, পেট্রলবোমায় নয় ||

ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতাল বার্ন ইউনিটের তালিকায় ঘটনাস্থল হিসেবে লিখা রয়েছে ‘টিএ রোড, বি-বাড়িয়া’ (ব্রাহ্মণবাড়িয়া)। হাসপাতালে ভর্তির তারিখ ১.১.১৫ ইং। মূল বিষয় রাজনৈতিক সহিংসতা। সহিংসতার ধরন হিসেবে বলা হচ্ছে দুইটি- পেট্রলবোমা নিক্ষেপ, ককটেল বিস্ফোরণ।

কিন্তু এসব তথ্যের কানাকড়িও মিল নেই বাস্তবে! এই রোগী- ব্রাহ্মণবাড়িয়ার বিজয়নগর উপজেলার হরষপুর গ্রামের আড়াই বছর বয়সী জুঁই আক্তার। ৫ শতাংশ অগ্নিদগ্ধ হয়ে বর্তমানে সে ঢামেক হাসপাতাল বার্ন ইউনিটে চিকিৎসাধীন। বুধবার প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বার্ন ইউনিট পরিদর্শনের সময় শিশুটিকে দেখে আবেগাপ্লুত হয়ে কেঁদেছিলেন। এ হিসেবে শিশুটি সকলের নজর কাড়ে।

কিন্তু কী ঘটেছিল? কোথায় ঘটেছিল? কবে ঘটেছিল? কেনই বা তাকে হরতাল-অবরোধের দগ্ধ হিসেবে দেখানো হল? বার্ন ইউনিট কর্তৃপক্ষ কী করেছে? বার্ন ইউনিট কর্তৃপক্ষ প্রণীত ৬২ দগ্ধের তালিকা যাচাই-বাছাইকারী সরকারের বিভিন্ন সংস্থা কী কাজ করেছে?

এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে আমাদের সময় ডটকমের অনুসন্ধান শুরু হয়। অনুসন্ধানের তথ্য সম্পূর্ণ বিপরীত পাওয়া গেছে হাসপাতালের তথ্যের সঙ্গে।

সরেজমিনে জানা গেছে, গত ১ ফেব্রুয়ারি সন্ধ্যা ৭টার দিকে শিশুটির অন্তসত্বা মা আয়েশা হরষপুরে নিজ গৃহে মোমবাতি জ্বালিয়ে শিশুটিকে একা রেখে বাথরুমে যান। এসে দেখেন শিশুর গায়ে আগুন, সে চেঁচামেচি করছিল। এরপর প্রতিবেশিদের সহযোগিতায় তাকে হরষপুর ইউনিয়ন স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে আনা হয়। কিন্তু সংকটাপন্ন হওয়া সেখান থেকে ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদর হাসপাতাল ও পরে ঢামেক বার্ন ইউনিটে আনা হয় ২ ফেব্রুয়ারি ভোরে। ঘটনার সময় তার বাবা জজ মিয়া বাড়িতে ছিলেন না।

এসব তথ্য পাওয়া গেছে জজ মিয়ার প্রতিবেশি শাহিদ সিরাজি, বিজয়নগর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা আবদুর রব, হরষপুর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান মো. শাহজাহান মিয়ার কাছ থেকে।

আবদুর রব বলেন, বিজয়নগরে রাজনৈতিক সহিংসতার কোনো খবর নেই। প্রথমে আমাদের কাছেও জুঁইয়ের খবর আসে। পরে এটি তদন্ত করে নিশ্চিত হই জুঁই মোমের আগুনে দগ্ধ হয়েছে।

মো. শাহজাহান বলেন, শিশুটি মোমবাতির আগুনে দগ্ধ, তা গ্রামবাসী জানেন। এই ইউনিয়নে চলমান রাজনৈতিক সহিংসতায় কোনো কিছু ঘটেনি। একটি মিছিলও হয় না, আর ককটেল বা পেট্রলবোমা বিস্ফোরণ তো দূরের কথা। প্রতিবেশি শাহিদ সিরাজিরও একই ধরনের কথা।

জানা যায়, ২ ফেব্রুয়ারি সকালে অস্ত্রোপচার করা হয় শিশুটির। এরপর নেয়া হয় আইসিইউ’র পাশ্ববর্তী পোস্ট অপারেটিভ কক্ষে। সেখানে শিশুটির দেখাশোনা করছেন তার দাদি হেলেনা বেগম। অন্তঃসত্বা হওয়ায় তার মা ও বুদ্ধি বিবেচনা শক্তি হওয়ায় তার বাবাকে হাসপাতালে আনা হয়নি।

৭ ফেব্রুয়ারি সরেজমিনে আমাদের সময় ডটকমের প্রথম কথা হয় জুঁইয়ের দাদির। ঘটনা সম্পর্কে জিজ্ঞাস করা হলে তিনি কিছু জানেন না বলে জানান। এরপর জানান, বাবা-মায়ের সঙ্গে বাসে চড়ে কোনো এক জায়গায় যাওয়ার পথে সেই বাসে বোমা নিক্ষেপের ঘটনা ঘটে ব্রাহ্মণবাড়িয়ায়। এরপর বলেন, আমি আসলে এইসব জানি না বাবা। আমারে আর জিগাইয়েন না।

তিনি আরও জানান, জুঁই পুড়েছে গ্রামের বাড়ি হরষপুরে, আর ঢামেক বার্ন ইউনিটে আনা হয় ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদর হাসপাতাল থেকে। তিনি জানান, জুঁইকে বার্ন ইউনিটে এনেছে তার ছোট ছেলে মহিম। আর মহিম বলছেন- বার্ন ইউনিটে এনেছেন তার মা হেলেনা।

কিন্তু হরতাল-অবরোধের দগ্ধ হিসেবে কেন দেখানো হল? সিলেটের একটি ওয়ার্কশপের দোকানে কর্মরত মহিম বৃহস্পতিবার আমাদের সময় ডটকমকে জানান, বার্ন ইউনিটে আনার কিছুদিন পর তিনি দেখতে আসেন এবং শুনতে পান ঢাকার একজন সিএনজি অটোরিকশা চালকের পরামর্শে এ কাজ করা হয়। চালক বলেছিলেন- হরতাল-অবরোধের কথা না বললে বার্ন ইউনিটে জায়গা পাওয়া যাবে না। অন্যদিকে হরষপুর গ্রামের কয়েকজন বলছেন- গ্রামের কিছু ব্যক্তি তাদের পরামর্শ দিয়েছে হরতাল-অবরোধের কথা বললে কিছু টাকা পাওয়া যাবে প্রধানমন্ত্রীর কাছ থেকে। সে অনুযায়ী এই কাজ করা হয়। জুঁইয়ের দাদি এসব বিষয়ে কিছু জানেন না বলে জানান।

এদিকে, ৭ ফেব্রুয়ারি জুঁইয়ের দাদির পর মুঠোফোনে কথা হয় মহিমের সঙ্গে। এদিন সন্ধ্যায় জুঁইয়ের আপন চাচা প্রবাসি বাচ্চু সৌদি আরব থেকে ফোন করেন এ প্রতিবেদকের কাছে। তিনি প্রথমদিকে অস্বীকার করলেও পরে অকপটে স্বীকার করেন, জুঁই মোমের আগুনে দগ্ধ হয়েছে।

বৃহস্পতিবার আমাদের সময় ডটকম জুঁইয়ের গ্রামের বাড়িতে গিয়ে কাউকে পায়নি। দরজা ছিল তালাবদ্ধ। তার প্রতিবেশিরা জানান, গ্রামে তাদের আর্থিক অবস্থা মধ্যম পর্যায়ে। তার বাবা জজ মিয়া কৃষিকাজ করেন। বাচ্চু মিয়া ছাড়াও জুঁইয়ের মেজো চাচা সাচ্চুও সৌদি আরব প্রবাসি। ভাইদের মধ্যে জজ মিয়া তৃতীয়। তারা সবাই একত্রে বাস করেন।

বার্ন ইউনিট সূত্র জানায়, তারা কেবল রোগীর নাম ঠিকানা ও দগ্ধের ধরণ লিখেন। কিন্তু কীভাবে, কোথায় হয়েছে তা লিখেন না। তবে হরতাল-অবরোধের বিষয় হওয়ায় তারা বাড়তি কিছু তথ্য সংগ্রহ করেন। তবে যাচাই-বাছাই করেন না। জুঁইয়ের ক্ষেত্রেও তাই করা হয়েছে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন চিকিৎসক বলেন, প্রথম আমাকে বলা হয়েছিল মেয়েটি ককটেল বিস্ফোরণে আহত। কিন্তু এ ধরনের কোনো আলামত দৃশ্যমান ছিল না। দেহে স্প্লিন্টারের আঘাতের চিহ্ন পাওয়া যায়নি। আবার বলা হচ্ছিল- পেট্রলবোমা। তখনই আমার সন্দেহ হয়েছিল। কিন্তু যাচাই করিনি ভয়ে। যদি আমার সন্দেহ ভুল হয় তাহলে আমার সমস্যা হবে নির্ঘাৎ এই ভেবে।

বার্ন ইউনিটের আবাসিক সার্জন ডা. পার্থ শংকর পাল বলেন, রোগী কীভাবে, কোথায় পুড়েছে তা তদন্ত করে দেখার দায়িত্ব আমাদের নয়। রোগীরা যা বলেন আমরা তা লিখে চিকিৎসা দিই।

প্রধানমন্ত্রীর দপ্তর থেকে নির্দেশ দেয়ায় আমরা কেবল তথ্য সরবরাহ করেছি। চূড়ান্ত তালিকা প্রস্তুত করা হয়েছে সরকারের বিভিন্ন সংস্থার সহায়তায়।

বুধবার প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের বার্ণ ইউনিটে হরতাল অবরোধে ক্ষতিগ্রস্থদের পরিদর্শন করতে যান। সেখানে ক্ষতিগ্রস্থ ৬৩টি পরিবারকে ১০ লাখ টাকার সঞ্চয়পত্র প্রদান করেন। পরিবারের তালিকায় জুঁইয়ের পরিবারও রয়েছে। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, এরপরেও যারা অবরোধ বা হরতাল সহিংসতায় ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন তাদের তালিকাও করা হচ্ছে।

বিশেষ দ্রষ্টব্য: প্রধানমন্ত্রী বার্ন ইউনিটে ক্ষতিগ্রস্ত যেসব পরিবারকে অনুদান দিয়েছেন তাছাড়াও অন্যান্য সকল পরিবারও সেখানে অবরোধের সহিংসতায় ক্ষতিগ্রস্ত। শুধুমাত্র এই শিশুটির পরিবারই অবরোধে ক্ষতিগ্রস্ত হয়নি। আমরা একটি দরিদ্র শিশুর অর্থ প্রাপ্তিতেও বাধা প্রদান করছি না। শুধুমাত্র তুলে ধরতে চেয়েছি যারা বিষয়টি তদন্ত করে রিপোর্ট দিয়েছেন সেই তদন্তের সত্যাসত্যকে।

এই প্রতিবেদন করার অর্থ এই নয় যে বার্ন ইউনিটে পেট্রোলদগ্ধ অসংখ্য রোগী নেই। ওই শিশুটির অভিভাবক বা অন্য কেউ এখানে প্রধানমন্ত্রীর কাছ থেকে হয়ত ভুল তথ্য দিয়ে সাহায্য নিয়েছেন। আমাদের সমাজে তারাও এধরনের সাহায্য পাওয়ার অধিকার রাখে। আমরা এ শিশুটির কষ্টে সমব্যথী।

সূত্র:আমাদের সময়.কম/ ১৩ ফেব্রুয়ারি ২০১৫।

Post a Comment

Previous Post Next Post