আমার একমাত্র সম্বল আমার আপা', বললেন শামীম ওসমান

গণমাধ্যম, পুলিশ-র‌্যাব, নিজ দল আওয়ামী লীগ—তাঁর কাছে সবই যেন তুচ্ছ৷ সাংবাদিকেরা তাঁর কাছে সারমেয়৷ র‌্যাব-পুলিশকে তুড়ি মেরে উড়িয়ে দিতে পারেন তিনি৷ নিজ দল আওয়ামী লীগের ওপরও তিনি ক্ষুব্ধ৷ কারণ, দলের অনেক নেতা তাঁকে পছন্দ করেন না। এর মধ্যেই ভাই সেলিম ওসমানকে নিয়ে নারায়ণগঞ্জকে বদলে দিতে চান তিনি৷

তিনি সরকারি দলের আলোচিত সংসদ সদস্য শামীম ওসমান৷

গত বৃহস্পতিবার বিকেলে নারায়ণগঞ্জ ক্লাবের দোতলার একটি কক্ষে উপস্থিত সাংবাদিকদের সঙ্গে তাঁর খোলামেলা আলাপচারিতার সারমর্ম করলে এই চিত্রই ফুটে ওঠে।

একজন সাংবাদিক বললেন, ‘প্রধানমন্ত্রী তো আপনার পক্ষে আছেন। সংসদে আপনার পরিবারের পক্ষে থাকার কথা বলেছেন।’ শামীম ওসমান বলেন, ‘আমার একমাত্র সম্বল আমার আপা (শেখ হাসিনা)। তিনি আমাকে স্নেহ করেন।’

আলাপের একপর্যায়ে পুলিশ কর্মকর্তাকে ফোনে হুমকি দেওয়ার প্রসঙ্গটি উঠে আসে৷ এবার শামীম ওসমান বলেন, ‘আমার নাম করে তো অনেকেই অনেককে ফোন করে। ও বাচ্চা ছেলে৷ তার পেটে আমি লাত্থি মারতে চাই না। আমি যদি বলি, ও তিন লাখ টাকা ঘুষ চেয়েছে, তা কি ঠিক হবে? ছেলেটা কয়দিন আগে বিয়ে করেছে, একটা সন্তান আছে (আসলে এখনো সন্তান হয়নি)।’

নিজের দল আওয়ামী লীগের নেতাদের প্রতি ক্ষোভ প্রকাশ করতেও ছাড়লেন না শামীম ওসমান। বললেন, ‘আমার দলের অনেক নেতাই আমাকে দেখতে পারে না। আমার বিরুদ্ধে বলে। সেই জন্য আমি বলি, আমি সরকারি দলে থেকেও বিরোধী দলের লোক।’

আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর প্রতি তাচ্ছিল্য প্রকাশ করে শামীম ওসমান বলেন, ‘আমি যদি বলি, এক ডাকে লাখ লাখ মানুষ হাজির হবে। ১১০০ র‌্যাব আর ৪০০ পুলিশ নিমেষে উড়ে যাবে। এসব র‌্যাব-পুলিশ আমার কাছে কিছু না।’

নারায়ণগঞ্জের সাত খুনের ঘটনার প্রসঙ্গ এলে শামীম ওসমান বলেন, ‘আমিই প্রথম বলেছি, ওই খুনের ঘটনায় র‌্যাব জড়িত। এ কথা বলার পর র‌্যাব আমারে মারতে স্নাইপার (গুপ্তঘাতক) এনেছিল। আমি শুরুতেই বলেছিলাম, ওই খুনে র‌্যাবের তিনজন জড়িত। পরে তাদের জবানবন্দিতেও তা প্রমাণিত হয়েছে।’

নূর হোসেনের প্রসঙ্গ টেনে শামীম ওসমান বলেন, ‘আমি যদি তাকে শেল্টারই (আশ্রয়) দিতাম, তাহলে সে আমাকে বাপ ডাকত না। সাহায্য চাইত না।’

খুন হওয়া কাউন্সিলর নজরুল ইসলামের বিষয়ে শামীম ওসমান বললেন, ‘র‌্যাবের ওরা আইসা নজরুলরে বলল, প্রতিদিন তুমি আমাদের দুই লাখ করে টাকা দিবা। বিনিময়ে এলাকায় মাদকের ব্যবসা করবা। নজরুল শোনে নাই। এসব বুঝতে পাইরা আমি নজরুলরে বলছিলাম, তুমি মারা পড়বা। বাঁচবা না।’

এই কথোপকথনের মধ্যে সন্ধ্যা ছয়টা থেকে তাঁর নেতা-কর্মীরা ওই কক্ষে আসতে শুরু করেন। একে একে তাঁরা শামীম ওসমানের পা ধরে সালাম করতে লাগলেন। তখনো নির্বাচনের ফলাফল ঘোষণা করা হয়নি৷ কিন্তু কর্মীরা তাঁকে অভিনন্দন জানাচ্ছিলেন৷ শামীম ওসমান তাঁদের মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে দিতে বললেন, ‘আমার কর্মীরা আমাকে ভালোবাসে। আমিও তাদের ভালোবাসি।’

বড় ভাই সেলিম ওসমান উপনির্বাচনে জিতলে দুই ভাই মিলে নারায়ণগঞ্জকে বদলে ফেলার কথাও বললেন শামীম ওসমান, ‘নারায়ণগঞ্জের সঙ্গে ঢাকার স্কাই ট্রেন চালু করব। শীতলক্ষ্যার পারে শিল্পাঞ্চল করব। আমার ভাইয়ের সঙ্গে ওয়ালমার্টের মতো বড় বড় প্রতিষ্ঠানের আলাপ হয়েছে। তারা সেখানে বিনিয়োগ করবে৷ একটি ভারতীয় কোম্পানির সঙ্গে আলাপ হয়েছে, তারা একটি আন্তর্জাতিক মানের হাসপাতাল করবে। এই সব করে আমি নেত্রীর কাছে তুলে দিয়ে রাজনীতি থেকে অবসরে যাব। নেত্রীর একজন কর্মী হিসেবে বাকি জীবন কাটাব।’

এই পর্যায়ে শামীম ওসমান ঘড়ি দেখলেন, তারপর মেঘলা হয়ে আসা আকাশের দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘আল্লাহর কুদরত, বৃষ্টি নামতাছে। নাইলে আজকা ওই মহিলার (মেয়র সেলিনা হায়াৎ আইভী) খবর ছিল। আমার কর্মীদের বুকে তুষের আগুন জ্বলতাছে, ওই আগুন যদি আজকা জ্বইলা উঠত, তাইলে সবকিছু ছারখার হয়ে যেত। বৃষ্টি আইসা ওই আগুন একটু ঠান্ডা করছে।’

আবারও ঘড়ির দিকে তাকিয়ে আওয়ামী লীগের ওই সাংসদ সাংবাদিকদের বললেন, ‘আপনারা এখন যান। আমার একজন “বাবা” আছে। আমি এখন নামাজ পড়ব। আমার বাবার সঙ্গে কথা বলব।’
উৎসঃ   প্রথম আলো

Post a Comment

Previous Post Next Post