এতোরোগী সামাল দেয়ার ক্ষমতা ঢাকা মেডিকেলের নেই

সকাল ১০টা। ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বহির্বিভাগ মেডিসিন বিভাগের সামনে দাঁড়িয়ে আছেন রোকেয়া বেগম। জ্বরসহ নানা রোগের চিকিৎসা করাতে এসেছেন এখানে।

রোকেয়া নারায়ণগঞ্জের চাষাঢ়া থেকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে এসেছেন আরও দুই ঘণ্টা আগে সকাল আটটায়। কিন্তু ডাক্তার আসেননি তখনও। ডাক্তার দেখাতে তার অপেক্ষা কখন শেষ হবে তা জানা নেই রোকেয়ার।

কেবল রোকেয়া নন, লাইনে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা গেল আরও ৫০ জনেরও বেশি রোগীকে। এদের সবার ডাক্তার দেখানোর কথা ছিল সকাল নয়টা থেকে।

এটা কেবল একদিনের চিত্র নয়, প্রায় প্রতিদিন এই সমস্যায় পড়তে হয়। এমনিতে রোগীর তুলনায় চিকিৎসক কম, তার ওপর সময়মতো ডাক্তার না আসায় রোগীদের অপেক্ষার প্রহর গুনতে হয়। টিকিট কিনে নিবন্ধন খাতায় কতক্ষণ অপেক্ষা করতে হয় তার নেই কোনো নিশ্চয়তা।

কেবল ডাক্তার দেখানো নয়, রোগীর নানা পরীক্ষা-নিরীক্ষার জন্যও ধরতে হয় দীর্ঘ লাইন। সুস্থ মানুষের পক্ষে লাইনে দাঁড়ানো তেমন কষ্টের না হলেও রোগীদের জন্য এ কাজ কতটা কঠিন তা সহজেই অনুমেয়।

দেশের প্রধান হাসপাতালটিতে দিন দিন বাড়ছে এই সমস্যা। পর্যাপ্ত শয্যার অভাবে ভর্তির সমস্যা ছাড়াও চিকিৎসা নিতে আসা রোগীদের ভোগান্তির অবসানের কোনো উদ্যোগই নেই সরকারের।

জনসংখ্যা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে রোগীর চাপ বাড়ছে প্রতিনিয়ত। কিন্তু এই হাসপাতালে যোগ হয় না নতুন লোকবল। ৪০ বছর আগের জনবল কাঠামো দিয়ে চিকিৎসা দেওয়া সম্ভব কি না সে প্রশ্ন তুলছেন হাসপাতালের কর্মীরা।

এ নিয়ে সরকারকে বারবার তাগাদা দিলেও কোনো কাজ হয়নি। নতুন লোক নিয়োগের উদ্যোগ আটকে যাচ্ছে বারবার।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ড. দীন মো. নূরুল হকের মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি ফোন ধরেননি।

এই হাসপাতালে চিকিৎসা ব্যয় তুলনামূলক কম হওয়ায় রোগীরা আসে দূর-দূরান্ত থেকে। নরসিংদীর রায়পুরা থেকে এসেছেন আবদুল কাদের। ঢাকাটাইমস টোয়েন্টিফোর ডটকমকে তিনি বলেন, ‘আমার গলব্লাডারে পাথর হইছে। নরসিংদীর এক হাসপাতাল অপারেশন করতে ৩০ থাইক্যা ৪০ হাজার টাকা লাগব কইছে। কিন্তু আমার অত টাকা নাই। তাই এইহানে আইছি। এইহানে দুই মাস থাকতে অইব, কিন্তু যে টাকা লাগব, তাইম দিতে পারব।’

সার্জারি বিভিগের এক চিকিৎসক বলেন, সরকারি হাসপাতালগুলোর চিকিৎসা ব্যয় তুলনামূলক কম হওয়ায় এখানে প্রতিদিন অনেক রোগী আসে। যে বিপুলসংখ্যক রোগী আসে তাদের চিকিৎসা দেওয়ার মতো ক্ষমতা এই হাসপাতালের নেই।

হাসপাতালের মেডিসিন বিভাগের আবাসিক চিকিৎসক রাজ দত্ত ঢাকাটাইমস টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, ‘বহির্বিভাগে প্রতিদিন প্রায় দুই থেকে আড়াই হাজার রোগী আসে। তাদের সামাল দেওয়ার জন্য যে লোকবল থাকা দরকার তা আমাদের নেই। সীমিত লোকবল নিয়ে কাজ করছি। এর থেকে বেশি কিছু বলার নেই।’

লাইন আর লাইন

লাইনে দাঁড়িয়ে ডাক্তার দেখানোর পরও শেষ হয় না অপেক্ষা। পরে ওষুধ নেওয়ার লাইন। মেডিসিন স্টোর বিভাগের সামনে দেখা গেল পাঁচটি লাইন। বিনামূল্যে ওষুধ নেওয়ার জন্য দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা গেল ২০০ থেকে ৩০০ রোগীকে।

প্রায় আধাঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়েও ওষুধ না পেয়ে রেগে গেলেন জাহানারা বেগম। তিনি জানান, পাঁচ ধরনের ওষুধের মধ্যে তিন ধরনের ওষুধের সরবরাহ নেই। তিনি বলেন, ‘ডাক্তার গ্যাস্টিকের জন্য ওমিপ্রাজল দিছে ১০টা। কিন্তু এইহানে কাইট্যা দিছে ছয়টা। বাকি এক ধরনের ওষুধ দিছে ১০টা।’

লাইনে দাঁড়ানো অন্য রোগীরাও তুলল একই ধরনের অভিযোগ। তাদের অভিযোগ, বেশির ভাগ ওষুধের সরবরাহ নেই বলে ফিরিয়ে দেওয়া হয় তাদের। আবার যা আছে তাও বিলিবণ্টন হয় না সঠিক নিয়মে।’

তবে রোগীদের এ অভিযোগ অস্বীকার করে মেডিসিন স্টোরের দায়িত্বপ্রাপ্ত চিকিৎসক মশিউর রহমান বলেন, ‘আগের থেকে এখন ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ওষুধের সরবরাহ বেশি। তবে হাসপাতালে যে ওষুধের সরবরাহ থাকে সেই ওষুধের নাম চিকিৎসকরা লেখেন না। লেখেন অন্য ওষুধের নাম। এ কারণে অনেক ওষুধ থাকার পরও রোগীদের দেওয়া সম্ভব হয় না।

ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে রেডিওলোজি ইমেজিং বিভাগে এক্স-রে করাতে এসেছেন সোলায়মান হোসেন নামের এক রোগী। তিনি প্রায় এক ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে আছেন। কিন্তু এক্স-রে করাতে পারছেন না। টাকা জমা দেওয়া থেকে শুরু করে এক্স-রে করানো ও সেই রিপোর্ট নেওয়া পর্যন্ত অনেক লাইন। এর পরও কম খরচ হওয়ার কারণে এখানে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করাতে আসেন রোগীরা।

সিটি স্ক্যান করাতে এসেছেন আল মাহমুদ। কিন্তু কোথায় তা করাতে হবে সেই জায়গা চেনেন না তিনি। হাসপাতালে এ ধরনের রোগীদের জন্য নেই কোনো সহায়তাকারী। প্রায় আধাঘণ্টা খোঁজাখুঁজির পর যদিও বা দেখা মিলল জায়গাটির, সেখানে আবারও লাইনের বিড়ম্বনা।

জানতে চাইলে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের রেডিওলোজি ইমেজিং বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ডাক্তার রবীন্দ্রনাথ সরকার বলেন, ‘আধুনিক যন্ত্রপাতিসহ লোকবল কম হওয়ায় রোগীদের এই কষ্ট সহ্য করতে হয়। আমাদেরও ভালো লাগে না এসব দেখে। কিন্তু কী করার আছে আমাদের পক্ষে? এই অবস্থা থেকে উত্তরণে প্রথমে হাসপাতালে পর্যাপ্ত লোকবল নিয়োগ দিতে হবে। এরপর কিনতে হবে প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি।’

ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের নিউরো-সার্জারি বিভাগে গিয়েও দেখা গেল ৩০০ থেকে ৪০০ রোগীর লাইন। এখানে আছে শিশুরাও। বড়রা তাও সহ্য করে থাকতে পারে, কিন্তু শিশুরা মানতে চায় না কিছুতেই।

২০৪ নম্বর ওয়ার্ডের ময়না বেগম এসেছেন চাঁদপুরের হাইমচর থেকে। তার মাথায় টিউমার হয়েছে। প্রায় দুই মাস হয়েছে এসেছেন এখানে। কিন্তু সিরিয়ালে নাম আসেনি, তাই অপারেশন হচ্ছে না তার। তীব্র যন্ত্রণায় হাসপাতালে কাতরাচ্ছেন তিনি। পাশে বসে মায়ের যন্ত্রণা দেখতে পেয়ে কাঁদছেন তার মেয়ে মরিয়ম আক্তার। মা-বোনের এই অবস্থা দেখে অনেকটাই নিরুপায় হয়ে বসে আছেন ছেলে মুক্তাদির।

মুক্তাদির এই দুই বছরে কয়েকবার বিভাগীয় প্রধান অধ্যাপক এহসান মাহমুদের সঙ্গে দেখা করেছেন মায়ের অপারেশনের ব্যাপারে। কিন্তু লম্বা সিরিয়াল থাকায় অপারেশনের সুনির্দিষ্ট তারিখ বলতে পারছেন না।

এ ব্যাপারে এহসান মাহমুদের সঙ্গে কথা বলতে চাইলে তিনি কিছু বলতে রাজি হননি।

সদ্য নির্মিত ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল-২ ভবনের দ্বিতীয়তলার প্যাথলজি বিভাগেও দেখা গেল একই লাইন। সেখানে প্রতিদিন প্রায় এক থেকে দেড় হাজার রোগী আসে পরীক্ষা-নিরীক্ষার জন্য। এদের মধ্যে এক ব্যক্তি টাকা নিয়ে রসিদ দিচ্ছে। তিন থেকে চার জন রক্তসহ নানা ধরনের নমুনা সংগ্রহ করছে। আর একজন সে পরীক্ষার রিপোর্ট দিচ্ছে। এখানেও দীর্ঘ অপেক্ষা নিয়ে অভিযোগের শেষ নেই রোগীদের।

এ ব্যাপারে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক মোস্তাফিজুর রহমান ঢাকাটাইমস টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে প্রতিদিন জরুরি বিভাগ ও বহির্বিভাগে সাত থেকে আট হাজার রোগী আসে। এদের মধ্যে দুই থেকে আড়াই হাজার লোককে ভর্তি করাতে হয়। প্রতিদিন অপারেশনও হয় প্রচুর। কিন্তু বর্তমানে আমরা ১৯৭৪ সালের জনবল দিয়ে সব কাজ চালাচ্ছি।

হাসপাতালের পরিচালক বলেন, ‘লোকবলের সংকট আমাদের দীর্ঘদিনের। বিষয়টি নিয়ে মন্ত্রণালয়কে একাধিকবার চিঠি দেওয়া হয়েছে। কিন্তু তেমন কোনো কাজ হয়নি। আর কাজ করতে গেলে কিছুটা ত্রুটি-বিচ্যুতি তো হতেই পারে। তবে ভালোমন্দ নিয়ে কাজ করছি।

উৎসঃ   ঢাকাটাইমস

Post a Comment

Previous Post Next Post